সুন্দরবন: পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন) | ৯:৩০ পূর্বাহ্ন, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন)
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন): প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। এই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কোননা কোন প্রাকৃতিক সম্পদ লুকিয়ে আছে। এই সম্পদ একদিকে যেমন বৈচিত্রময় অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্টমন্ডিত। ইতিমধ্যে এই সকল অঞ্চলে পর্যটনের প্রসার লক্ষ্য করা গেছে। তবে প্রকৃতির এই বৈচিত্র যদি সঠিকভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরা যায় তবে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বে পর্যটনের এক অনন্য তীর্থস্থান। বিশ্বের বুকে যে কয়টি বিষয় বাংলাদেশকে এক ও অদ্বিতীয় করেছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশপরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে। সুন্দরবন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।যা এই প্রাকৃতিক সম্পদের অনন্যতার প্রমাণ বহন করে। সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, খাল, শত শাখানদী, কাদাচর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। মোট বনভূমির প্রায় ৩১.১ শতাংশ অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদী নালা, খাল-বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। সুন্দরবনের প্রতি পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান সৌন্দর্য। যার প্রতিটি অঞ্চল এক একটি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টরূপে পর্যটকদের কাছে ধরা দেয়। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে সাথে এই বনের জীববৈচিত্র এটিকে পৃথিবীর অন্য যেকোন পর্যটন কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্ররুপে উপস্থাপন করেছে। সুন্দরবন এর নামের সাথে যেই বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত তাহল বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনভূমিটিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রাহরিণ, কুমির, ডলফিন ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। ২০১৫ সালের বন বিভাগের জরিপ মোতাবেক ১০৪ বাঘ থাকার কথা জানা যায়। তবে ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২১। যদিও এই সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। কারণ ২০০৪ সালের বন বিভাগের জরিপে বলা হয়েছিল সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। সুতরাং বর্তমান পরিসংখ্যান আমাদের দেশের পর্যটনের জন্য তথা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মোটেই শুভকর নয়। অপরদিকে সুন্দরবন এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১০০০০০ থেকে ১৫০০০০ চিত্রাহরিণ রয়েছে বলে জানা যায় যা এর সৌন্দর্য বহুগুনে বৃদ্ধি করে থাকে।পর্যটকরা বনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে চিত্রাহরিণের ছুটাছুটি দারুন উপভোগ করে থাকে। সুন্দরবন এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ একঘেয়েমি ক্লান্ত কর্মময় জীবন ভুলে গিয়ে নিজেকে সজীব করে তুলে। সুন্দরবনের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পর্যটকরা ছোট ছোট লঞ্চে করে বিভিন্ন শাখা নদী-খালে ঘুরে বেড়ায়। এতে করে তারা যেমন চারদিকের প্রকৃতির মনোরম রূপ উপভোগ করতে পারে ঠিক তেমনি এর বিচিত্র প্রাণীজগত ও তারা অবলোকন করতে পারে। নদী খাল দিয়ে ছুটে চলতে চলতে চোখের সামনে ধরা দেয় বিভিন্ন প্রকার পাখি, জলজ প্রানী ও হরিণের পাল। তবে পর্যটকের অধীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার যা খুব কম পর্যটককেই ধরা দেয়। তাইতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অ্যাডভেঞ্চার, ভয় ও শিহরণের এক মেলবন্ধন এই সুন্দরবন। জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। প্রকৃতির অকৃপণ হাতের সৃষ্টি। সুন্দরবন হতে পারে দেশ তথা বিশ্বের অন্যতম পর্যটন স্থান যা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে স্থান করে নিতে পারে। সুন্দরের রানি সুন্দরবন ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়। বলা হয়ে থাকে সুন্দরবন দিনে চারবার তার রূপ বদলায় যার সকালে এক রূপ, দুপুরে অন্যরূপ আর পড়ন্ত বিকালে ধারণ করে অন্যরূপ। আর রাতে গহীন অরণ্যের মাঝে এক ভিন্ন শিহরণ তৈরি করে সুন্দরবন। তাছাড়া অমাবশ্যায় কিংবা চাঁদনী রাতে নানান রূপে পর্যটকদের কাছে ধরা দেয় সুন্দরবন। বিস্তীর্ণ সুন্দরবনের বেশ কয়টি দর্শনীয় স্থান রয়েছে যার মধ্যে করমজল, কটকা, কচিখালী, হারবাড়িয়া, হিরণপয়েন্ট, দুবলারচর উল্লেখযোগ্য। এই স্থানগুলোর প্রতি পর্যটকদের আলাদা আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। মংলা থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে করমজল পর্যটন কেন্দ্রটির অবস্থান। এটি একটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। এছাড়া এখানে রয়েছে হরিণ ও কুমির প্রজনন ও লালন পালন কেন্দ্র। এখানে বনের মধ্যে দিয়ে তৈরী করা হয়েছে আকাঁবাকাঁ কাঠের তৈরী পথ যা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পর্যটকরা বনের সৌন্দর্যের সাথে সাথে সুন্দরবনের আদি বাসিন্দা রেসাস বানরের সন্ধান পাবে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্রময় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা রেঞ্জে অবস্থিত সমুদ্রের তীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র ‘কটকা অভয়ারণ্য’।বাঘ দেখা ও নিরাপদে থাকা- এ দুই-ই সম্ভব সুন্দরবনের চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র কটকা অভয়ারণ্য থেকে। এখানে প্রায়ই দেখা মেলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। এছাড়া মনোরম চিত্রাহরিণের দল, বিভিন্ন জাতের পাখি, শান্ত প্রকৃতি এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির কারণে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় কটকা অভয়ারণ্য সবসময়ই আলাদা স্থান দখল করে আছে। তাছাড়া কচিখালীতে আছে সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্যের হাতছানি। ভ্রমণ-পিপাসুদের জন্য কচিখালী হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। নানা জাতের হরিণ, গাছে গাছে হাজার রকমের পাখির দেখা মেলে এইখানে। জলে ডলফিন আর কুমির-শুশুক মাঝে-মধ্যেই ভেসে উঠছে। তাইতো সুন্দরবনে যে কোন পর্যটকই আসুক না কেন কচিখালী যাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তাদের মনে থেকেই যায়। সুন্দরবনের দক্ষিণাংশের একটি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য হল হিরণ পয়েন্ট। এর আরেক নাম নীলকমল। প্রমত্তা কুঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে, খুলনা রেঞ্জে এর অবস্থান। হিরণ পয়েন্ট ইউনেস্কো ঘোষিত অন্যতম একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। হিরণ পয়েন্ট একটি অভয়ারণ্য হওয়ায় এই স্থান অনেক বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি এবং সরিসৃপের নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে দেখা পাওয়া যায় চিত্রা হরিণ, বন্য শুকরের; পাখিদের মধ্যে আছে সাদাবুক মাছরাঙা, হলুদবুক মাছরাঙা, কালোমাথা মাছরাঙা, লার্জ এগ্রেট, কাঁদাখোঁচা, ধ্যানীবক প্রভৃতি। এছাড়া আছে প্রচুর কাঁকড়ার আবাস। আর আছে রঙ-বেরঙের প্রজাপতি। হিরণ পয়েন্ট থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে কেওড়াসুঠিতে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। যেখান থেকে পর্যটকরা বিশাল এলাকা একনজরে দেখতে পান। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন যেমন দেশী বিদেশী পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় স্থান তেমনি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। বনবিভাগের তথ্যমতে ২০১৬-১৭ সালে সুন্দরবনে প্রায় ১ লক্ষ ২৩ হাজার দেশী পর্যটক ভ্রমণ করে যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল প্রায় ৯১ হাজার ৮শ’ জন। অপরদিকে২০১৫-১৬ সালে প্রায় ২ হাজার ৫শ’ জন বিদেশী পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করে যা ২০১৪-১৫ সালে ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮শ’ জন। ২০১৬-১৭ সালে সুন্দরবন বনবিভাগ পর্যটকদের কাছ থেকে মোট ৮২ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় করে যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৭৫ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা। মূলত বিদেশী পর্যটকের থেকে বেশী রাজস্ব আহরণ করা হয় তাই বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে রাজস্বের পরিমাণ কয়েকগুন বেড়ে যাবে। সুন্দরবনে দেশী পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেলে ও বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা আশানুরূপ নয়। এর প্রধান কারণ হল সঠিক প্রচার প্রচারণার অভাব। তাছাড়া সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটকদের জন্য নেই কোন বিনোদনের ব্যবস্থা। তাই সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটনকে আরো বেগবান করতে হলে নিতে হবে নানা পদক্ষেপ। তবে সবকিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র। পরিবেশ ও সুন্দরবনের প্রানী ও উদ্ভীদকুলের ক্ষতি সাধন করে কোন উন্নয়ন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও বিগত কয়েক বছরে সুন্দরবনে কয়লা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যবাহী নৌযানডুবির কারণে হুমকির মুখে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদ এবং জলজ প্রাণীসহ সুন্দরবনের সমগ্রজীব বৈচিত্র্য। এটি রোধ করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া সুন্দরবনে প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অন্যান্য প্রানীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসাবে চোরা শিকারী ও বন উজাড় করাসহ নানাবিধ কারণ রয়েছে। তাই এই সকল সমস্যা চিহ্নিত করে অতি দ্রুত সমাধান করতে হবে। সুন্দরবন আমাদের জন্য প্রকৃতির এক অপরূপদান। বর্তমানে এটি আমাদের পর্যটনের জন্য এক অনন্য সম্পদ। সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটনের ব্যাপক প্রসার করা গেলে আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে সাথে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। তবে সবার আগে প্রয়োজন এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা এবং একই সাথে এর জীববৈচিত্র অক্ষুন্ন রাখা। আমাদের মনে রাখতে হবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের সকল প্রকার উন্নয়ন, পরিকল্পনা হতে হবে পরিবেশ বান্ধব। আর এই বিষয়ে আমাদের সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনগন ও পর্যটকসহ সকলকে কাজ করে যেতে হবে। তার এর ফলেই আমরা সুন্দরবন থেকে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের সুফল পাব। লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

