বাংলাদেশে হাওর পর্যটনের সম্ভাবনা
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন): | ৯:৪৭ অপরাহ্ন, ১৯ মার্চ, ২০১৯

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন):
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন): চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি। প্রকৃতি তার নিজ হাতে সাজিয়েছে এই বাংলাকে। নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, প্রবাল দ্বীপ, সমুদ্র সৈকত, হাওড় বাওড়, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, চা-বাগান, জলপ্রপাত, পুরাকীর্তিসহ অনেক দর্শনীয় স্থান বনভূমি কি নেই আমাদের এই দেশে। পাশাপাশি এ দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গরিমা অনেক পুরনো। এই দেশের রূপ বৈচিত্রের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অপার সম্ভাবনার উর্বর ক্ষেত্র এ দেশ। এদেশের শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য বরাবরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাক দিয়ে যায়।
যে কোন দেশের উন্নয়নের জন্য পর্যটন শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশেও পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা বর্তমান। এই দেশের পর্যটন স্থানগুলো অনায়াসেই যেকোন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে টেনে নেয়। বাংলাদেশের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে না। সাম্প্রতিকালে কক্সবাজারকে ঘিরে যেই সকল উন্নয়ন পরিকল্পন নেওয়া হয়েছে তাতে এই অঞ্চলের পর্যটন ব্যাপক গতি পাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশের অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন স্থানের নাম কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত যেখানে অবস্থান করে অবলোকন করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।
বাংলাদেশে পর্যটনের যেই সকল উপাদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সম্পদ হল হাওর। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি হাওর। হাওরের প্রতিটি সময় একজন পর্যটকের কাছে উপভোগ্য। বছরের একেক সময় হাওর অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধরা দেয়। হাওরের পর্যটনের প্রধান উপজীব্য হল হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপন ও গ্রামীন পরিবেশ অবলোকন করা। বৈশাখের ফসল তোলার মৌসুমে প্রকৃতির নতুন রূপ আর হাওরাঞ্চলের মানুষদের জীবন-জীবিকার ব্যস্ততা প্রকৃতিবান্ধব সারল্যতায় ভরপুর। শীতে কুয়াচ্ছন্ন হাওরে থাকে অতিথি পাখির অবাদ বিচরণ, বর্ষায় হাওরের ছোট ছোট দ্বীপের মতো বাড়িঘর, শেষ বিকেলে সূর্যাস্তের মায়াবতী দৃশ্য কিংবা বিকেলের স্নিগ্ধতায় দূর পাহাড়ের হৃদয়কাড়া সৌন্দর্য সবকিছুকে বিধাতা যেন তার অকৃপণ হাতে সাজিয়েছেন। হাওরের ভরা পানিতে রাতে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকার কুপি বাতির জ্বলজ্বল আলোতে মৎস্য শিকারিদের বিচরণ হাওরবাসীর সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি বহন করে। হাওরের পানিতে চাঁদের আলোর মায়াভরা স্মৃতি যে কারো হৃদয় কাড়বে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-এই সাতটি জেলার ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে ৪২৩টি হাওর নিয়ে হাওরাঞ্চল গঠিত। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় ১৩৩টি, কিশোরগঞ্জ জেলায় ১২২টি, নেত্রকোনায় ৮০টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩টি হাওর রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার ৪৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ এই হাওরাঞ্চলের আয়তন প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল অঞ্চলে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে যার সুবিধা আমরা এখনো উপভোগ করতে পারিনি।
রাজধানী ঢাকার কাছের জেলা কিশোরগঞ্জ-এর রয়েছে হাওর পর্যটনে ব্যাপক সম্ভাবনা। মূলত বর্তমান রাষ্ট্রপতি হাওর বেষ্টিত কিশোরগঞ্জ জেলার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখায় সেখানে তৈরি হয়েছে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা। হাওর প্রধান অষ্টগ্রাম উপজেলার উন্নয়নের মাধ্যমে সারা বছরব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। বর্তমানে এই উপজেলার যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নয়নে তৈরি করা হয়েছে সুপ্রশস্ত রাস্তাঘাট ও ব্রিজ। পর্যটকদের সুবিধার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। হাওর ও এর চারপাশের জনপদ পর্যটকদের জন্য প্রধান উপকরন। এইখানে রয়েছে হাওরের বুকে ভেসে ভেসে স্থানীয় মানুষের জীবন উপভোগ করার সুযোগ। তাছাড়া পর্যটকদের কাছে হাওরের তাজা মাছের রয়েছে ব্যাপক সুনাম। আর এইখানকার পনিরের সুনাম সারা দেশজড়ে রয়েছে।
হাওরের বুকে নৌকায় ভেসে ঘুরে বেড়াতে সবার ভালো লাগবে। তবে ভরা পূর্ণিমায় হাওরের সৈন্দর্য্য যে কাউকে আকর্ষন করবে। হাওরের রূপ দেখা ছাড়াও অষ্টগ্রামে দেখার মত আছে ৪০০ বছরের পুরনো কুতুবশাহ মসজিদ। এটি সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্টের পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট। সর্বোপরি এইখানকার প্রাকৃতিক সৈন্দর্য্য সাথে বর্তমানে অবকাঠামো উন্নয়ন হাওরের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে।
মূলত আমাদের দেশে হাওর পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এর শুরু কিন্তু খুব বেশী দিনের নয়। মূলত দেশীয় কিছু তরুন পর্যটক নিজ উদ্দ্যগে হাওরের সৈন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য নৌকা নিয়ে হাওরের বুকে ভেসে বেড়াত। তার পর আস্তে আস্তে এর ব্যাপকতা লাভ করতে শুরু করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাওর অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য তেমন কোন অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা গড়ে উঠেনি। এর ফলে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তাসহ অন্যান আরো অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে দু’ একটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটর সিলেট অঞ্চলে হাওর ভিত্তিক ট্যুর প্যাকেজ চালু করেছে।
আমাদের পাশের দেশ ভারত তাদের এই উন্মুক্ত জলাশয়ে পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে। মূলত ভারতের কেরালা এর প্রচলন খুব বেশী দেখা যায়। সেখানে জলাশয়ের বুকে ভেসে ভেসে একজন পর্যটক প্রাণ প্রকৃতি ও চারপাশের মানুষের জীবন অবলোকন করতে পারে। আর তার জন্য বিশেষ ধরনের জলজান ব্যবহার করা হয় যাতে পাঁচ তারকা মানের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থাকে। পাশাপাশি পর্যটকের জন্য স্থানীয় শিল্প সংস্কৃতি উপভোগ করার ব্যবস্থা থাকে। এতে প্রচুর পরিমান বিদেশী পর্যটক প্রতিবছর কেরালা ভ্রমণ করে থাকে। আমাদের দেশেও এই রকম সুযোগ সুবিধা তৈরী করা গেলে হাওর কেন্দ্রিক পর্যটনে ব্যাপক চাহিদা তৈরী হবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। হাওর অঞ্চলকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যাতে করে পর্যটোন শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে এই অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা সম্ভব হয়।
লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

