হাওরে ইটের ভাটা: পরিবেশ দূষণ রোধে করণীয়...
গোলাম রসূল | ৪:৫৩ অপরাহ্ন, ২৪ জানুয়ারী, ২০১৮

Golam Rosul
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওর আর তার পার্শ্ববর্তী তিনটি জেলার হাওরের মধ্যে বিরাট পার্থক্য করে দিয়েছে ইটের ভাটা। অন্য হাওরগুলো যেখানে মাছ আর পাখিতে সয়লাভ সেখানে অষ্টগ্রামের হাওর পরিপূর্ণ হচ্ছে একের পর এক ইটের ভাটা স্থাপনের মাধ্যমে। প্রয়োজনের অধিক সংখ্যক ইটের ভাটার কারণে গোটা অষ্টগ্রামের প্রাণী পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের প্রচুর ক্ষতিসাধন হচ্ছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে অষ্টগ্রাম ও তার আশপাশে ২০টির অধিক ইটের ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে অষ্টগ্রাম বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ইটের ভাটার মাধ্যমে। বাতাসের প্রবাহ বেশিরভাগ সময় উত্তরমুখী থাকা-ই এর কারণ। অষ্টগ্রামের ইটের ভাটাগুলো নিজ এলাকা ও প্রতিবেশি এলাকার পরিবেশের ক্রমাগত ক্ষতি সাধন করেই চলেছে।
ইটের ভাটার কারণে প্রধান যেসব ক্ষতি হচ্ছে মোটাদাগে সেগুলি হল: এক: যে ফসলি জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে সে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। মাটির উপরের স্থরে পলি জমে। সেই মাটি ইটের ভাটায় ব্যবহার করার কারণে সেখানে সঠিকভাবে পলি জন্মাতে কয়েক বছর লেগে যায়। ফলে ফসল উৎপাদন কম হয়।
দুই: ইটের ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার ফলে বাতাস দূষিত হওয়ার পাশাপাশি নারিকেল গাছের উৎপাদন ক্ষমতা কমাচ্ছে। গবেষণা করে দেখা গেছে ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নারিকেলের কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় নারিকেল হলেও সেগুলি অপুষ্ট থাকছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এই সুস্বাদু ফলটির উৎপাদন অনেক কমে গেছে। তিন: ইটের ভাটার কালো ধোঁয়া শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসসহ নানা ধরণের রোগের কারণ এই কালো ধোঁয়া। সর্বোপরি দূষিত বাতাস সকলের জন্যই ক্ষতিকর।
এখন প্রশ্ন হল এই সমস্ত কারণে কি ইটের ভাটাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে? আমি বলব না বন্ধ নয়। এর সমাধান আছে। ইটের ভাটা বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষা করতে চাইলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হব। সেখানে কর্মরত প্রচুর মানুষ বেকার হবে। ইটভাটায় বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে। বিদ্যমান ইটের ভাটাগুলো নি¤েœাক্ত পথ অবলম্বন করে গোটা হাওর এলাকাকে দূষণের হাত থেকে বাচাঁতে পারে।
এক: পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম যথাযতভাবে অনুসরণ করে চিমনি তৈরি করা। অধিকাংশ ইটের ভাটায় সঠিক চিমনি নেই। এবং সঠিক জ্বালানী ব্যবহার করা।
দুই: ইটের পরিবর্তে সিমেন্ট কনক্রিট ব্লক তৈরি করা। বিদ্যমান ভাটাতেই শুধুমাত্র প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কনক্রিট ব্লক তৈরি করতে হবে। কনক্রিট ব্লক তৈরিতে মাটির দরকার হয়না। শুধুমাত্র বালু আর সিমেন্টের দ্বারা এটি প্রস্তুত করা হয়। অষ্টগ্রাম ও তার আশপাশের নদীগুলোতে প্রচুর বালি রয়েছে। সেখান থেকে বালু সংগ্রহ করলে একদিকে যেমন নদীগুলোর নাব্যতা ফিরে আসবে, তেমনি অন্যদিকে ফসলি জমিও অনুর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাবে। কনক্রিট ব্লকের একটি ধরণ হল হলোব্লক। এতে ব্লকের ভেতরে ফাঁপা থাকে। ফলে এ হলোব্লক দিয়ে ঘর নির্মাণ করলে ঘর অনেক বেশি শীতল থাকে। জাপান, সোদিআরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন ইটের পরিবর্তে সিমেন্ট কনক্রিট ব্লক তৈরি করছে। বাংলাদেশ সরকারও সম্প্রতি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে।
হাওর এলাকার ইটের ভাটার মালিকগণ আপনারাও যত দ্রুত সম্ভব এই প্রযুক্তি চালু করুন। রক্ষা করুন হাওরের প্রাণী পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের।
লেখক, সাংবাদিক, হাওরের সন্তান।

