শনিবার, ২ মে ২০২৬
 
vatirrani News

প্রচ্ছদ মুক্তমঞ্চ বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটন

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটন

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন) | ১২:০৬ অপরাহ্ন, ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯

1547705170.jpg
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন)

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (কাঞ্চন): বাংলাদেশে পর্যটনের যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে আজকে আশার আলো ছড়াচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাসমূহের নৈমিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপার সম্ভবনাময় আমাদের এই বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আদর্শ পর্যটন নগরী। এটি যা শুধু অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করবে না সেই সঙ্গে বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরবে। বাংলাদেশ পর্যটন পুলিশের তথ্যমতে, এ দেশে প্রায় ৮শ-এর বেশি পর্যটন স্থান রয়েছে। এই সকল স্থানকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ শিল্প ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।

২০১৮ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড টুরিজম এন্ড ট্রাভেল কাউন্সিলের প্রতিবেদন মোতাবেক ২০১৭ সালে পর্যটন খাত বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোট কর্মসংস্থানের শতকরা ৩ দশমিক ৮ ভাগ অবদান রাখে। অপরদিকে মোট জিডিপিতে শতকরা ৪ দশমিক ৩ ভাগ অবদান রাখে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) হিসাব অনুযায়ী বছরে ১ কোটি দেশীয় পর্যটক দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নাগরিকদের পর্যটনে অংশগ্রহণে উত্সাহিত করছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক অর্থনীতি নির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার ‘ভিশন ২০২১’ লক্ষ্য স্থাপন করেছে। তার প্রতিফলনস্বরূপ ডিজিটাল বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতের উন্নতি, স্বাস্থ্য সুবিধার উন্নতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চূড়ান্তভাবে দারিদ্র্যসীমা হ্রাস করা, প্রতিটি ধাপে তথ্য প্রযুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো পর্যটন শিল্প বিস্তারের সঙ্গে অর্জনের দিক থেকে সামন্তরিক। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো পর্যটন হতে পারে ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি নিখুঁত হাতিয়ার। এটি এমন একটি শিল্প যা সমাজের সকল নাগরিকের ওপর বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ২০২১ সালের লক্ষ্য অর্জনে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হতে পারে একটি আদর্শ ক্ষেত্র, কেননা প্রশিক্ষণের জন্য কম অবকাঠামোগত সুবিধা ও দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ এই শিল্পে আগ্রহ বেশি সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকার এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসছে। যার ফলে পর্যটন শিল্পে নীরব বিপ্লব সংঘটিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই সকল উন্নয়ন পরিকল্পনার মাঝে সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড় বেঁধে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ অন্যতম। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার। প্রতিবছরে এতে বাড়তি ২শ’ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এই সকল স্থানে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বর্তমান সরকারের কিছু পদক্ষেপ বিশেষ করে নাফ ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা পর্যটন বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে। কারণ এতে বিনিয়োগ করছে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত কোম্পানি সিয়াম সিয়াম ইন্টারন্যাশনাল। প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটি ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। ২৭১ একর জায়গা জুড়ে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি ১২ হাজারের বেশি লোকের কর্মসংস্থান জোগাবে। আর এই নাফ ট্যুরিজম পার্ক উন্নয়নের প্রকল্প ব্যয় ১৭০ কোটি টাকা এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১৯ সাল। ইতোমধ্যে বেজা কর্তৃপক্ষ নাফ ট্যুরিজম পার্কের উন্নয়ন কাজ হাতে নিয়েছে। অন্যদিকে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক স্থাপনে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অপরদিকে সোনাদিয়া ইকো-ট্যুরিজম পার্ক স্থাপনের উদ্দেশে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। এছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফে প্রস্তাবিত নাফ ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে এ ঋণ নেবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

যে কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদনের লক্ষ্যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যবহার পারে টেকসই উন্নয়ন সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে। তাই গবেষণাধর্মী কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপযোগী তথ্যের উদঘাটন ও সংরক্ষণপূর্বক তা নিঃসন্দেহে জনকল্যাণে সমৃদ্ধি আনয়নে উল্লখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় পর্যটন শিল্পের সংযোজন শুধু আর্থিক সুফলতা বয়ে আনবে না সেই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে এর সুফল ছড়িয়ে দিবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটন শিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Post Your Comment

সম্পাদক: গোলাম রসূল, উপদেষ্টা সম্পাদক: কুদ্দুস আফ্রাদ ও ইব্রাহিম খলিল খোকন, নির্বাহী সম্পাদক: এস. এম. ফরহাদ
বার্তাকক্ষ: 01911214995, E-mail: info@vatirrani.com
Developed by CHAHIDA.COM