প্রচ্ছদ ধর্ম ও জীবন কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
মুহাম্মদ এমদাদুল হক জাবের | ১০:০৫ পূর্বাহ্ন, ১৭ আগস্ট, ২০১৮

মুহাম্মদ এমদাদুল হক জাবের
কুরবানি অারবী শব্দ। ইহার অাভিধানিক অর্থ- নৈকট্য অর্জন করা, কাছাকাছি যাওয়া।
শরিয়তের পরিভাষায়- নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পশু অাল্লাহর ওয়াস্তে সওয়াবের নিয়তে জবেহ করাই হচ্ছে কুরবানি। অাল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, অাপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্য নামাজ পড়ুন অার কুরবানি করুন। [সুরা কাউসার,অায়াত-২]
কুরবানি বিধান যুগে যুগে অাল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ হতে অবতীর্ণ সমস্ত শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। অাল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, অামি প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি একটা কুরবানি নির্ধারিত করেছি যেন তারা আল্লাহ নাম নেয় তার প্রদত্ত বাকশক্তিহীন চতুষ্পদ পশুগুলোর উপর। অতএব, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্যই,সুতরাং তারই সম্মুখে আত্মসমর্পণ করো এবং হে মাহবুব! সুসংবাদ শুনিয়ে দিন সেই বিনীত লোকদেরকে।[সুরা হজ্জ,অায়াত -৩৪]।
পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কুরবানি করেছিলেন হযরত অাদম অালাইহিস সালামের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল। কুরবানি একটি অার্থিক ইবাদত। প্রত্যেক স্বাধীন মুসলমান,মুকিম,সক্ষম তথা নেসাব পরিমান সম্পদের অধিকারী হলে কুরবানি করা ওয়াজিব। প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষ থেকে ছাগল, ভেড়া,দুম্বা যে কোন একটি জবেহ করতে পারবে অথবা উট বা গরু মহিষ সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে জবেহ করতে পারবে। দরিদ্র ও মুসাফিরের কুরবানি ওয়াজিব নয়। অাল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমসমূহের মধ্যে অন্যতম হল কুরবানি। মূলত: একারণেই প্রিয় নবিজি প্রতি বছর কুরবানি করতেন। অার সামর্থবান ব্যক্তিরা কুরবানি বর্জন করলে তাদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করতেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন,হযরত অাবু হুরাইরা [রা.] অানহু হতে বর্ণিত,রাসুল সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,যে ব্যক্তি সামর্থ থাকা সত্বেও কুরবানি করে না সে অামাদের ইদগাহে না অাসে। [ইবনে মাজাহ শরিফ]
কুরবানির ফজিলত অর্জন করতে হলে অবশ্যই প্রয়োজন ঐ ধরণের অাবেগ,অনুভূতি,প্রেম-ভালবাসা যা ছিল সাইয়্যেদুনা ইব্রাহিম অালাইহিস সালামের মধ্যে। কেবল রক্ত প্রবাহিত করা ও গোশত খাওয়ার নাম কুরবানি নয়। বরং আল্লাহর দরবারে নিজের যাবতীয় জানমাল বিলিয়ে দেওয়া এক প্রেমময় শপথের নাম কুরবানি । কেবল পশুর গলায় ছুরি চালানো নয় বরং সকল কু-প্রবৃত্তি ও পশুত্বের গলায় চুরি চালানোই হল আসল কুরবানি। এ উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য উদ্দেশ্য কুরবানি করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা,এর মধ্য কোন সাওয়াব নেই। অথএব যে কুরবানি সাথে তাকওয়া নেই, আত্ম বিসর্জনের অনুভূতি নেই, আল্লাহর দরবারে সেই কুরবানির কোন মূল্য নেই। তাকওয়াপূর্ণ ইবাদতই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য।
আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকিদের পক্ষ হতে কুরবানি কবুল করেন। [সূরা আল মায়িদাহ-২৭]
হাদিসের আলোকে কুরবানির অনেক ফজিলত রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিঅাল্লাহু আনহুম হতে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সাহাবাগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম! এ কুরবানির প্রথা কি? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের জন্য কি কল্যাণ নিহত আছে, তিনি বললেন পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তারা পুনরায় জিজ্ঞেসা করলেন,বকরীর পশমেও কি তাই? জবাবে তিনি বললেন, বকরীর প্রতিটি বিনিময়েও একটি করে নেকি অাছে। [মিশকাত শরিফ]
অন্য হাদিসে রয়েছে,হযরত অায়েশা ছিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা অানহা হতে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,অাল্লাহর নিকট কুরবানি দিনে অামল সমূহের মধ্যে [ফরজ কাজ ব্যতীত] রক্ত প্রবাহ [কুরবানী] হতে অধিক প্রিয় অন্য কোন অামল নেই। কিয়ামত দিবসে অাল্লাহ পাক কুরবানী পশুকে তার শিং,পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করবেন। অার কুরবানীর পশুর রক্ত জমিনে গড়িয়ে পড়ার পূর্বেই অাল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা খুশি মনে কুরবানি কর। [তিরমিযি শরিফ]
আলোচ্য হাদিসের আলোকে প্রমাণিত, হয় কুরবানি একটি হলেও উহার প্রতিদান অনেক বেশি। কেউ সকাল সন্ধা তা গণনা করলেও কুরবানির পশুর কেশ কত তার কোন হিসাব বের করা সম্ভব নয়।সহজে এতো অধিক সওয়াব অর্জন করার বিকল্প পন্থা জগতে বিরল।
অতএব, সামর্থ্যবান ও সম্পদশালীর উচিত নিজের কুরবানি পাশাপাশি আত্মীয়- স্বজনের জন্যও কুরবানি করা, যেন তারাও এই সওয়াবের অংশীদার হতে পারে। যদি সম্ভব হয় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পক্ষ হতে, নিজের পীর-মুর্শিদের পক্ষ হতে কুরবানি করার মধ্যে বিশেষ উপকারিতা রয়েছে। যে ব্যক্তি কুরবানি করা থেকে বিরত থাকবে সে যেন এ মহান নিয়ামত হতে বঞ্চিত থাকবে।
লেখক-শিক্ষার্থী, জামেয়া অাহমদিয়া সুন্নিয়া অালিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফাজিল অনার্স অাল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

