প্রচ্ছদ ধর্ম ও জীবন শুহাদায়ে কারবালা, শিয়া, এজিদী এবং হোসাইনী মুসলমান
শুহাদায়ে কারবালা, শিয়া, এজিদী এবং হোসাইনী মুসলমান
হাফেজ ক্বারী মুহাম্মদ জাকির আশরাফী | ৭:০৭ অপরাহ্ন, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

হাফেজ ক্বারী মুহাম্মদ জাকির আশরাফী
৬১ হিজরিতে কারবালায় আহলে বায়েত এবং নবী-পরিবারের (রাঃ) উপর যে বিভীষিকাময় নিষ্ঠুর নির্মম অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, এর ফলে মুসলমানগণ ৩ ভাগে ভাগ হয়ে যায়। শিয়া, হুসাইনী মুসলমান আর এজিদী মুসলমান।
আর এজন্যই উপমহাদেশের খ্যাতনামা আলেম ও কবি মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরের কবিতা,
'কাতলে হোসাইন আসল মে মুর্গে ইয়াজিদ হ্যায়,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ'।
দলগুলো কি কি?
১/ শিয়া: একদল মুসলমান নামধারী কুফাবাসি চিঠির পর চিঠি দিয়ে ইমাম হুসাইন (আঃ)-র নামে বায়াত নিতে থাকে এবং তাঁদেরকে কুফায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। ইমাম হোসাইন (রাঃ) যখন সপরিবারে কুফার নিকটবর্তী হলেন, কুফার নতুন গভর্নর কুখ্যাত ইবনে জিয়াদের (এজিদের হারামজাদা চাচার ছেলে) ভয়ে এরা একে একে সরে পড়তে থাকে। ইমাম হেসাইন (রাঃ) এবং তাঁর পরিবার যখন এজিদী বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত, এরা তখন দেখেও না দেখার ভান করে লেজ গুঁটিয়ে পলায়ন করে। ইমাম তখন চিৎকার করে বলেছিলেন, "তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই!" কিন্তু আফসোস তারা ছিল নামধারী মুসলমান। এরাও নামাজ পড়তো, রোজা রাখতো, নামাজে তাশাহুদে আহলে বায়েতের প্রতি সালাম ও দরূদ পাঠাতো। কিন্তু কারবালার ঘটনা এদের আসল মুখোশ খুলে দিল। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর এরা ফিরে এসে মাতম শুরু করে দেয়, "হায় হুসাইন! হায় হুসাইন!" এরা নিমকহারামের দল। ইসলামের জন্য জীবন দেবার সুযোগ পেয়েও এরা কাপুরুষের মতো আহলে বায়েতকে একা ফেলে রেখে নিজেদের জান ও মাল নিয়ে পিছু হটে। ঠিক একইভাবে এরা মাওলা আলী (রাঃ) এর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কুফাবাসির বিশ্বাসঘাতকতা সর্বজনবিদিত।
পরে এরাই নিজেদেরকে শিয়া বা আলী (রাঃ) অনুসারী বলে দাবী করে। এদের মিথ্যাচার সব জঘন্যতাকে হার মানায়। এরা কিয়ামত পর্যন্ত মাতম করতেই থাকবে যা বিন্দুমাত্রও কাজে আসবে না।
২/ এজিদী মুসলমান: কারবালার মাঠে দু'দল মানুষ ছিল। দুটি দলই নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করছিল। দু'ইটি দলের পুরুষদের মুখে দাঁড়ি ছিল। গায়ে ইসলামী লেবাস ছিল। উভয় দলই আল্লাহ্'কে বিশ্বাস করতো। উভয়েই নামাজ পড়তো। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও। কিন্তু একদলের লেবাস ইসলামী হলেও এদের মনে নবী (দ.) এর প্রেম বা ভালোবাসা ছিল না। এদের অন্তরে নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা আর জিঘাংসা বিরাজ করছিল। এদের মুখে আল্লাহর নাম, অথচ অন্তরে নবী-পরিবার তথা আহলে বায়েতকে ধ্বংসের পরিকল্পনা ছিল। এই দলটির কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যুদ্ধের ময়দানেই নিজেদের ভুল বুঝতে সক্ষম হন। তাঁরা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ইবনে জিয়াদের বাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে ইমামের দলে যোগ দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ করে নিজেদেরকে শাহাদাতের অমিয় সুধা পানে যোগ্য করে তোলেন। এদের একজন হলেন আল-হুর (রহ.)।
বাকি লোক গুলো অর্থ আর দুনিয়ার মোহে মরীচিকার পিছনে ছুটতে থাকে। এরা নবী-পরিবারকে ধ্বংসের উল্লাসে মেতে উঠে। ফোরাত নদীর পানি এরা আহলে বায়েতের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়। গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দেন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এজন্য আক্ষেপ করে বলেছিলেন,
"বোকারা বুঝতে পারেনি যে ইমাম হুসাইন (রাঃ) পানি পিপাসায় এবং অসহায়ের মতো শহীদ হননি বরং তিনি আসল ও নকলের ভাগটি পরিষ্কার করে দেখিয়ে গেছেন। ইমাম হুসাইন (রাঃ) জুলজীনের (ঘোড়ার) পদধূলি বলতেও নিজেকে আমি লজ্জাবোধ করি, অথচ আমি "হাসান" যদি সেদিন কারবালার মাঠে একটি আঙ্গুল দিয়েও খোঁচা দিতাম তাহলে, আল্লাহর কসম সঙ্গে সঙ্গে পানির নহর বয়ে যেতো।" সোবাহান আল্লাহ্!
ফোরাতের পানি বন্ধ করে দিয়ে সেই মুসলমানরা নবী-পরিবারকে কষ্ট দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, একে একে শহীদ করে দেয় ৭২ জন পুরুষ এবং কিশোরকে। তবুও এদের খুনের নেশা মেটে না। যে দেহে রাসূল ﷺ বারবার আদরে আদরে, চুমোয় চুমোয় ভরে দিয়েছেন, যে শিশুর কারণে রাসুল ﷺ নিজে সেজদা প্রলম্বিত করেছেন, যা দেখে আল্লাহ্ পাক নিজেও হেসেছেন আর জিব্রাইল ফেরেশ্তা'কে পাঠিয়ে সুসংবাদ জানিয়েছেন, রাসুলের সে প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কিছু পথভ্রষ্ট, মুসলমান নামধারী, নামাজী, কালেমা উচ্চারণকারী মুসলমান কিন্তু আদতে মুনাফিক অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। কেমন নির্দয়ভাবে শহীদ করে তার বর্ণনা দিতে চাই না। কারণ পাঠকদের হৃদয়কে বারবার ক্ষত-বিক্ষত করতে প্রাণ কাঁপছে। সে নিষ্ঠুরতায় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলেও সেই নরাধম মুসলমান নামধারী, নামাজীদের প্রাণে একটুও ভয় লাগে নি। এরা অত্যন্ত উল্লাসভরেই তা সমাপন করে।
তাতেও নবী-পরিবারের প্রতি এদের ঘৃণা থামে না। এরা একে একে ৭২ জন শহীদের দেহ থেকে পবিত্র মস্তকগুলো বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বর্তমানে এদের উত্তরসূরি আইএস যেভাবে মানুষকে জবাই করে সেভাবে। নিথর দেহগুলোর উপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে লাশগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে। কল্পনা করুণ তো একবার! কাদেরকে এরা খুন করেছিলো, আর কাদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করেছিলো আর কাদের দেহের উপর দিয়ে এরা ঘোড়া চালিয়েছিল? ওই মানুষগুলো ছিল আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল ﷺ এর কাছে অতি সম্মানিত, আদরের এবং নবী-পরিবারের মহামূল্যবান ধনরত্ন। মা ফাতেমা (রাঃ)এর নয়নের মণি, মাওলা আলী (রাঃ)এর প্রাণের পুতুল তাঁরা। এরা মনে করে এদের নামাজ আর এবাদত এদেরকে পরকালে মুক্তি দেবে? না, তা কক্ষনো হবার নয়, যত এবাদতই এরা করুক, তা কোনই কাজে আসবেনা।
কেননা, “হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক (দ.) ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি যদি সম্মানিত রুকন এবং সম্মানিত মাক্বামের মধ্যবর্তী স্থানে সারিবদ্ধ হয়ে থাকে। অতঃপর নামায পড়ে এবং রোযা রাখে, কিন্তু এই অবস্থায় তার মৃত্যু হয় যে, সে আহলে বায়েতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। তাহলে সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” নাঊযুবিল্লাহ!’ (যাখাইরুল উক্ববা লি-মুহিব্বে ত্ববারী ১/১৮, মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইন, হাকীম নিশাপুরি রহ.)
৩/ হোসাইনী মুসলমান: আর একদলের পরিচয় হয় হোসাইনী মুসলমান হিসেবে। যাদের মনে রাসূল (দ.), আহলে বায়েত, তাঁর সাহাবা এবং হক্কানি ও নেক্কার বান্দাদের জন্য রয়েছে ভালোবাসা এবং সম্মান। পবিত্র আশুরা এলে এরা মিথ্যা ও লোকদেখানো মাতম করে না, বরং কারবালার আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের ঈমান, আক্বীদা ও আমলকে শক্ত করে নেন। এরা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেন, হকের জন্য ইমাম হুসাইন জীবন দিয়েছেন, নিজের মাথা দিয়েছেন কিন্তু অন্যায় এবং মিথ্যার কাছে মাথা নত করেন নি। আল্লাহু আকবর! এ কারণেই খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনউদ্দিন চিশতি (রাহ.) বলেন-
শাহ আস্ত হোসাইন, বাদশাহ আস্ত হোসাইন,
দ্বীন আস্ত হোসাইন, দ্বীন পানাহ আস্ত হোসাইন,
ছেরদাদ ওয়া না দাদ দস্ত দরে দস্তে ইয়াজিদ,
হক্কা কে বেনায়ে লা ইলাহ আস্ত হোসাইন।
অর্থাৎ- আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হলেন হোসাইন (রাঃ), বাদশাহ হলেন হুসাইন (রাঃ),
ধর্ম হলেন হোসাইন (রাঃ), ধর্মের আশ্রয়দাতা হলেন হোসাইন (রাঃ)।
দিলেন মাথা মোবারক, না দিলেন বায়াতের হাত, ইয়াজিদের হাতে। সত্য তো ইহাই যে কালেমার সমস্ত স্তম্ভই হলো হোসাইন (রাঃ)।
আল্লাহ্ তা'য়ালা আমাদেরকে হোসাইনী মুসলমান হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমিন। বিহুর মাতে সায়্যেদুল মুরসালিন।

